নাগকন্যা - পর্ব (২)



আলোকে গোসল করাতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল করলাম আলোর ঘাড়ে একটা তীর চিহ্নের মত দাগ। এ দাগ আমি আলোর শরীরে আগে কখনও দেখে নি। এমন দাগ দেখে বেশ চিন্তিত হয়ে গেলাম। বারবার দাগটা মুছার জন্য সাবান দিয়ে ঘষতে লাগলাম।কিন্তু কোনভাবেই দাগটা উঠতেছিল না।মনে হচ্ছে এটা আলোর জন্মদাগ। কিন্তু জন্মের পর আলোর শরীরে এমন দাগ আমি খেয়াল করি নি। আর সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য লেগেছে এটা দেখে যে আমি যখনেই আলোর ঐ দাগটাই স্পর্শ করি তখনেই আলোর চোখ আর শরীর নীলবর্ণ ধারণ করে।বেশ অবাক হয়ে গেলাম এটা দেখে। তাই বারবার দাগটা ধরে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। আর প্রতিবারেই একেই ঘটনা ঘটতে লাগল।



শাদাফকে ডাক দিলাম দেখার জন্য।শাদাফ ও দেখার পর চমকে গেল।এখন আলোকে কেন জানি সাধারণ কোন বাচ্চা হিসেবে মানতে পারছি না।সাধারণ কোন বাচ্চা হিসেবে মানতে খুব কষ্ট হচ্ছে।কারন আস্তে আস্তে আলোর বয়স বাড়ার সাথে সাথে আলোর মধ্যে ব্যাতিক্রম সব বিষয় গুলো পরিলক্ষিত হতে শুরু করল।আলোর বয়স যখন ১ বছর হল।তখন খেয়াল করতাম আলো কোনদিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে সেটা শূন্যে ভেসে যেত।আবার প্রচন্ড শব্দ করে নীচে আচঁড়ে পড়ত।মাঝে মাঝে ঘুম থেকে উঠে একা একা হাঁটতে থাকত।১ বছরের বাচ্চার এমন একা একা হাঁটার বিষয়টা বেশ অবাক লাগল।আর খেয়াল করতাম সে যখন ঘুমের মধ্যে হাঁটত তখন তার চারপাশে বেশ গরম বাতাস বইত।দরজা নিজে থেকে খুলে যেত।একদিন আলোকে না আটকিয়ে আমি আর শাদাফ আলোর পিছু পিছু যেতে লাগলাম।খেয়াল করলাম আলো আমাদের বাগান পেরিয়ি একটা নির্জন জায়গায় গেল।জায়গাটায় একটা টিলার মত মাটির স্তূপ ছিল।সেখানে গিয়ে খেয়াল করলাম আলোর সামনে একটা দুধের বাটি রাখা আর আলো সেটা একা হাতে নিয়ে খেতে লাগল।দুধটা খাওয়ার সময় আলোর শরীর নীল বর্ণ ধারণ করল।আলোর চোখ ফুটবলের মত ঘুরতে লাগল।আলোর চারপাশের গরম বাতাসের পরিমাণটা বেড়ে গেল।যতক্ষণ পর্যন্ত আলোর দুধটা পান করতে লাগল।ততক্ষণ পর্যন্ত চারদিকে এমন পরিবেশ বিরাজ করল।
দুধ পান শেষ হওয়ার সাথে সাথে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেল।আলো আবার বাড়ি যাবার পথ ধরে হাঁটতে লাগল।আমরাও আলোর পিছু পিছু বাড়ি চলে আসলাম।আলো ঘরে আসার পর একা একাই ঘুমিয়ে গেল।আমি আলোর এরকম অবস্থা থেকে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম।এবার আমি আর শাদাফ দুজনেই নিশ্চিত হলাম আলো কোন সাধারণ বাচ্চা না।কিন্তু আলো কে?কিভাবে আলোর পরিচয় পাব বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম দুজন।আর ঐ স্তূপটায় বা কিসের আর ঐখানে দুধের বাটিটাই বা কে রাখল?প্রশ্নগুলো যেন আরও অস্থির করে তুলল দুজনকে।
আমি শাদাফকে ধরে কাঁদতে লাগলাম।আর বলতে লাগলাম
-শাদাফ! আলো কি তাহলে কোন পিশাচ নাকি কোন মায়া জাদু।এতবছর পর একটা বাচ্চা পেলাম।নিজের ছেলেকে হারালাম তার বিনিময়ে একটা মেয়ে পেলাম।এখন কপালে কি এমন আছে যার জন্য আমাদের এরকম পরিস্থতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।যে করে হোক আলোর পরিচয় বের করতে হবে।তা না হলে আস্তে আস্তে বিষয় গুলো হাতের বাইরে চলে যাবে।

শাদাফ আমাকে শাত্বণা দিয়ে বলল
-অধরা এত ধৈর্য হারাইও না।হ্যা এটা পরিষ্কার আলো কোন সাধারণ বাচ্চা না।তবে আমি নিশ্চিত আলো কোন পিশাচ হতে পারে না।কারন আলো পিশাচ হলে এতদিনে সবার ক্ষতি করত।কিন্তু আলো কারও ক্ষতি করে নি।এসব কিছু জানার কিছু একটা উপায় তো বের করতে হবে।সব কিছুর শুরু আছে আর শেষ ও আছে।শুরু হয়েই শেষ হওয়ার জন্য।চিন্তা করে মাথা গরম কর না।সময়েই সব প্রশ্নের উত্তর মিলিয়ে দিবে।মনে রেখ গোলক ধাঁধায় ঘুরতে ঘুরতেও মানুষ একটা সময় মূল বিন্দুতে এসে পৌঁছায়।উপায় তো একটা আছেই শুধু সঠিক ভাবে বের করতে হবে।

আমি কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম
-কি এমন উপায় বের করব বল।কোন ডাক্তারের কাছে যাব কিনা বল?
-অধরা এগুলো বিষয় ডাক্তার হ্যান্ডেল করতে পারবে না।আমি খুৃঁজ নিব।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কিছু একটা ব্যাবস্থা করব।তুমি ধৈর্য হারাবে না প্লিজ।সবসময় ধৈর্য স্থির রাখবে আর নিজেকে শান্ত রাখবে।তাহলে দেখবে সবকিছু ঠিক লাগছে।মানুষ হেরে যায় কখন জান যখন ধৈর্য ধরে অটল থাকতে না পারে।সুতরাং আমাদের ও সঠিক সময় পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে হবে।
-তুমি যা বলবে তাই হবে।আমি আলোকে হারাতে চাই না।
-অধরা সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।সবকিছু মেনে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরী করতে হবে।এখন আর কোন চিন্তা কর না।চুপচাপ ঘুৃামাতে যাও।এতক্ষণ যা দেখেছ সবকিছু ভুলে যাও।ভেবে নাও দুঃস্বপ্ন দেখেছ।
আমি একটা দম ধরে শ্বাস নিয়ে বললাম
-চেষ্টা করব ভুলে যেতে।

এপর দুজনে ঘুমাতে গেলাম।আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে গেলাম।এত মায়া মাখা মুখের মেয়ে সত্যিই কখনও পিশাচ হতে পারেনা।এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে গেলাম।পর দিন সকাল ভোরে কলিং বেল এর আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গল।দরজা খুলে দেখলাম এক বৃদ্ধা দাড়িঁয়ে আছে।বৃদ্ধা আমাকে দেখে বলল
-মা একটু খাবার হবে।দুদিন যাবৎ কিছু খাই নি।ক্ষুদায় পেট ফেটে যাচ্ছে।আমাকে কিছু খেতে দাও।

বৃদ্ধাকে দেখে বেশ মায়া হল আমার। আমি বৃদ্ধাকে বললাম আপনি এখানে দাঁড়ান আমি খাবার নিয়ে আসছি।এ বলে রান্না ঘরে গেলাম খাবার আনতে।খাবার আনার পর খেয়াল করলাম দরজার সামনে কেউ নেই।আমি দরজার বাহিরটা খেয়াল করলাম কাউকে পেলাম না।বৃদ্ধা কোথায় গেল বুঝতে পারলাম না।দরজা আটকিয়ে আলোর কাছে এসে বেশ চমকে গেলাম কারন আলো গলায় কি একটা পাথরের মালা থেকে একটা ঝলমলে আলোর রশ্নি ঘরটাকে এতই আলোকিত করেছে যে, সে আলোর ছটায় তাকাতে পারছিলাম না কোনভাবে।চোখ যেন আপনা থেকেই বুজে যেতে লাগল।বেশ খানিকক্ষণ পর আলোর রেখাটার ত্যাজ কমতে লাগল।আলোর ত্যাজটা কমার সাথে সাথে তাকিয়ে দেখলাম আলোর গলায় মালাটা গলার সাথে মিলিয়ে গিয়েছে।আলোর কাছে গিয়ে মালাটা ধরতে নিলাম।খেয়াল করলাম মালাটা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।ব্যাপারটা আমাকে আরও চিন্তায় ফেলে দিল।এরপর থেকে এ মালাটা একটা নির্দিষ্ট সময় সকাল বেলার দিকে ঝলঝল করে জ্বলতে থাকে তবে সেটা প্রতিদিন না।প্রতি সোমবার দিন নিয়ম করে এমন হয়।আর আলো দুধটাও পান করতে যায় প্রতি রবিবার রাতে।তার উপর ফুটবলের মত চোখ ঘুরানো আর শূন্যে ভেসে যাওয়া জিনিসের কাহিনী তো আছেই।এভাবে কেটে গেল বেশ কয়েক বছর।এসবের মধ্যে আলো বড় হতে লাগল।এক সময় এ বিষয় গুলো বেশ অদ্ভুত লাগলেও এগুলো এখন আমার আর শাদাফের কাছে স্বাভাবিক লাগতে লাগল।
আলোর বয়স এখন ৬।আলোকে স্কুলে ভর্তি করার পারফেক্ট সময় এটা।আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে আলোকে স্কুলে ভর্তি করাব।তাই আমি আর শাদাফ পরদিন সকালে আলোকে স্কুলে নিয়ে যাই।আর আলোকে স্কুলে ভর্তি করালাম।আলোর ক্লাসের সময়সূচি দেওয়া হল।আলোকে প্রতিদিন ক্লাসে নিয়ে যাওয়া আমার একটা রোটিন হয়ে দাঁড়াল।প্রতিদিন ক্লাসে নিয়ে যেতাম আবার নিয়ে আসতাম।এর মধ্যে আলোর রাতে উঠে ঐ জায়গায় যাওয়া আর ফুটবলের মত চোখ ঘুরানো,কোন জিনিসের দিকে তাকালে শূন্যে ভেসে যাওয়া এসবকিছুই থেমে গিয়েছিল।মনে মনে বেশ স্বস্তি পেলাম যে আলো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে।কিন্তু আলোর এরকম কেন হল এ প্রশ্নের উত্তর গুলো ও এখনও মনে ঘুরপাক খাই।সবকিছু থেমে গেলেও আলোর শরীরে তীরচিন্হতে ধরলে আলোর শরীর নীল হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা এখনও যায় নি। যতবারেই ওর শরীরের তীর চিন্হটাই আমার হাত লাগত ততবারেই ওর শরীর নীল হয়ে যেত।আশ্চর্যজনক ভাবে শুধু আমার হাত লাগলেই এমনটা হত।শাদাফের হাত বা অন্য কারও হাত লাগলে এমন হত না।মাঝে মাঝে মনে হয় আমার হাতে কি কোন জাদু মায়া আছে যা কিনা আলোর শরীর এমন বিবর্ণ করে দিচ্ছে।এসব প্রশ্নগুলো সবসময় আমার মনের মধ্যে এলোমেলো হয়ে ঘুরতে থাকে।মায়ের মন তো তাই চিন্তাটাও বেশি কাজ করে।তবুও চিন্তাটা এড়িয়ে চলে আলোকে নিয়ে ব্যাস্ত থাকার চেষ্টা করতাম।


খেয়াল করলাম আলোর আর্ট করার নেশা বেশি।কাগজ পেলেই আর্ট করতে বসে পড়ত।আর সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য লাগে তখন, আলো যখনেই আর্ট করে তখনেই একটা পুড়াবাড়ি আর্ট করে।প্রায় সময় আমি ওকে জিজ্ঞেস করি
- মা তুমি এ বাড়িটা কোথায় দেখেছ।এ বাড়িটা তো আশে পাশে কোথাও নেই।তাহলে তুমি কিভাবে আঁকলে।
আলো আলতো আলতো গলায় জবাব দিল

- মা আমি যখনেই চোখ বন্ধ করি এ বাড়িটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে।এ বাড়িটা বেশ আপন মনে হয়।জান মা বাড়িটাকে আমি স্বপ্নেও দেখি।আমি যখন এ বাড়িটাকে স্বপ্নে দেখি তখন মনে হয় আমি সেটা বাস্তবে দেখতেছি।
এরকম অদ্ভুত বাড়ি এত ছোট বাচ্চা স্বপ্নে দেখে আবার অণুভব ও করে।বিষয়টা তেমন একটা স্বাভাবিক ব্যাপার ও না।আমি যতবারেই আলোকে স্বাভাবিক ভাবতে চাই ততবারেই আলোর মধ্যে অদ্ভূত কিছু বিষয় লক্ষ্য করি যা আমি এড়িয়ে যেতে চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারি না।আর্ট করার বিষয়টাও আমি এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম।তাই ব্যাপারটা এড়িয়ে গিয়ে আমি আলোকে আর্টের কোচিং এ এডমিট করাই যেহেতু আলোর আর্টের উপর ঝোঁক বেশি।

আলোর সবকিছু ভালোভাবে চলতে লাগল।ক্লাস,কোচিং সব ভালোভাবেই যেতে লাগল।কিন্তু মাঝে মাঝে আলো ঘুমের মধ্যে ইদানিং বিড়বিড় করে কি জানি বলে।আবার হাতে কি জানি ইশারা দেয়।শাদাফ আর আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম যে আলো স্বাভাবিক কোন বাচ্চা না।তবে আলো কে?আর আলোর মধ্যে এমন কেন হচ্ছে এটার উত্তর জানার মত কোন উপায় পাচ্ছিলাম না।শাদাফ অনেক চেষ্টা করেছিল কিন্তু পারে নি।তবে আলো যে কোন ক্ষতিকর কেউ না সেটা আমি আর শাদাফ ভালোই বুঝতে পেরেছিলাম।তাই আলোর সাথে এত ঘটনার পরও আমরা আলোকে আদর করা থেকে বঞ্চিত করে নি।

বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে বেশ স্বাভাবিকভাবেই যাচ্ছিল সব। কিন্তু আলোর আর্ট এর শিক্ষিকা আমাকে হঠাৎ ডাক দিয়ে যা বলল আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। বুঝতে পারলাম না আলো এমন কেন করল। 

আর্টের শিক্ষিকা বলল আলো... (চলবে.....)

গল্পটির পরবর্তী পর্ব পেতে গল্পটি নিচের শেয়ার অপশন থেকে অথবা লিংক কপি করে ফেসেবুকে শেয়ার করুন

SHARE THIS

0 Comments:

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।