মা হাসিনা ভাত দে, নইলে একটু বিষ দে !


দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খাদ্য সংকট। লকডাউনের কারণে সবাই এখন ঘরবন্দী। বিশেষ দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যাানচালক, ফেরিওয়ালা, ভিক্ষুক, রাজমিস্ত্রী, হকার্স, পরিবহন শ্রমিক, ফুটপাথের দোকানদার ও গলির ভেতর চা বিক্রেতারা চরম খাদ্য সংকটে পড়েছে। ঘরে খাবার না থাকায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তারা এখন দিশেহারা। সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ খাবার সহায়তা তারা পাচ্ছে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রীরা প্রতিদিনই ভাঙ্গা রেকর্ড বাজিয়ে যাচ্ছেন যে, দেশের একটি মানুষও না খেয়ে থাকবে না। প্রত্যেকটি ঘরে ঘরে আমরা খাবার পৌছে দেবো।

কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূণ ভিন্ন। লকডাউনের কারণে যারা কর্মহীন হয়ে পড়েছে, তাদের অধিকাংশ মানুষ এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো খাবার সহায়তা পায়নি। আর যারা পেয়েছে সেটাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। কাউনিন্সলর, চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের কাছে ত্রাণ সামগ্রী আসলেও তারা এগুলো অসহায় মানুষের মধ্যে সঠিকভাবে বিতরণ করছে না। কিছু নেজরা আত্মসাত করছে, কিছু নিজেদের আত্মীয় স্বজনকে দিচ্ছে আর কিছু দিচ্ছে দলীয় নেতাকর্মীদেরকে। যারা প্রকৃত অসহায় ও গরিব তারা কিছুই পাচ্ছে না।

যার কারণে ক্ষুধার্ত মানুষগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে লকডাউন ভেঙ্গে রাস্তায় নেমে ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভ করছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা গেছে, সোমবার দেশের একাধিক স্থানে ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে শত শত মানুষ। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন-আমরা খাবার পাচ্ছি না, সরকারের ত্রাণ যাচ্ছে কোথায়?

গাইবান্ধায় ইউএনও অফিস ও পৌরভবনে বিক্ষোভ…
ত্রাণের দাবিতে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে ইউএনও কার্যালয় চত্বরে বিক্ষোভ এবং গোবিন্দগঞ্জে পৌরভবন ঘেরাও করেছে কর্মহীন দিনমজুররা। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের মন্দুয়ার এবং জয়েনপুর গ্রামের দুই শতাধিক কর্মহীন দিনমজুর এ বিক্ষোভে অংশ নেন।

গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহীন আকন্দ বলেন, “মেয়র সরকারি সহায়তার ৩৫ মেট্রিক টন চাল তুলেছেন।“সেই চাল নিজের ব্যক্তিগত বাজার অফিস থেকে নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের মাঝে বিতরণ করছেন।”
তিনি জানান, পৌর শহরের প্রকৃত অসহায় কর্মহীন ব্যক্তিদের মেয়র কোনো ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছেন না। যাদের সরকারি ত্রাণের প্রয়োজন নেই তারা মেয়রের পছন্দের লোক হওয়ায় শুধুমাত্র ত্রাণ পাচ্ছেন।

আরো অভিযোগ তিনি জানান, তার এলাকাসহ আরও সাত কাউন্সিলরের এলাকায় কেউ এক কেজি চালও ত্রাণ পায়নি।
ফোন করে ত্রাণ চাওয়ায় কৃষককে মারধর
নাটোরের লালপুরে সরকারি সহায়তার হটলাইন নম্বর ৩৩৩-এ ফোন করে ত্রাণ চাওয়ায় এক কৃষককে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান মারধর করেছেন। রবিবার এ ঘটনা ঘটে। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে।



স্থানীয়রা জানান, লালপুরের ৯নং অর্জুনপুর-বরমহাটি(এবি) ইউনিয়নের আঙ্গারিপাড়া গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলামসহ গ্রামের প্রায় ৩০০ জন করোনাভাইরাসের এ সময়ে বেকার হয়ে পড়েন। একদিন গণমাধ্যমে কৃষক শহিদুল জানতে পারেন, ৩৩৩ নম্বরে ফোন করলে খাদ্য সহায়তা পাওয়া যায়। এরপর গত ১০ এপ্রিল ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে তিনিসহ গ্রামের সবার জন্য খাদ্য সহায়তা চান। সেখান থেকে খাদ্য সহায়তার আশ্বাস মেলে। ৩৩৩-এর মাধ্যমে অবগত হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চেয়ারম্যানকে ওই এলাকায় ত্রাণ সহায়তার নির্দেশ দেন।

এর দুদিন পর গত ১২ এপ্রিল স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুস সাত্তার ওই কৃষককে চৌকিদার দিয়ে ডেকে এনে নিজেই মারধর করেন।

খাদ্য সহায়তার দাবিতে কর্মহীন, অতিদরিদ্র দিনমজুর মানুষ গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে ঢাকা-বরিশাল সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ খুলনায় খাদ্যের দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ।

খাদ্য সরবরাহ করার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন খুলনার রূপসা উপজেলার পূর্ব রূপসা এলাকার মানুষ। তাঁরা রূপসা এলাকার বিভিন্ন মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় কাজ করতেন। বর্তমানে কারখানাগুলো বন্ধ। তাই পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিতে না পারায় আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে তাঁরা রাস্তায় নেমে আসেন। পূর্ব রূপসা এলাকার মানুষ আজ মিছিল করতে করতে পূর্ব রূপসা বাসস্ট্যান্ড ফাঁড়ির সামনে অবস্থান নেন। পরে তাঁরা খুলনা-মোংলা মহাসড়কে সেনাবাহিনীর টহল গাড়ি পেয়ে তাঁদের কাছে দাবিগুলো তুলে ধরেন।

গোপালগঞ্জে সড়ক অবরোধ:
খাদ্য সহায়তার দাবিতে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে ঢাকা-খুলনা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কর্মহীন, দিনমজুর ও অতিদরিদ্র মানুষ। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মুকসুদপুর উপজেলার দিগনগর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের মোড়লপাড়া, কারিকরপাড়া ও হিন্দুপাড়ার বাসিন্দারা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের রথখোলা নামক স্থানে অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় সড়কের দু’পাশে অসংখ্য যানবাহন আটকা পড়ে।

বাড্ডায় ত্রাণের জন্য বিক্ষোভ:
ত্রাণের জন্য রাজধানীর বাড্ডা এলাকার লিংকরোডে শতশত মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। পেটের ক্ষুধায় তারা রাস্তায় নেমেছেন বলে জানান। সেখানকার কাউন্সিলরদের কাছে অনেক ত্রাণ গেলেও তারা এর কিছুই পাচ্ছেন না। মুখ দেখে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে বলে তারা দাবি করছেন। এই কারণে ত্রাণ দেয়ার পদ্ধতিতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর তদারকি চেয়েছেন অনেকে। কেউবা আবার সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ত্রাণ দেয়ার দাবি করেছেন।

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে তাদের বিক্ষোভ শুরু হয়। বেলা ১১টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করলেও কাজ হয়নি। এ সময় রাস্তায় রিকশা উল্টে রেখে বিক্ষোভ দেখান তারা। বিক্ষোভে অংশ নেয়া এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা মেয়রের (কাউন্সিলর) কাছে গিয়েছিলাম। তারা বলেছেন, আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের দেয়ার পর যদি কিছু থাকে তাহলে আপনাদের দেব, নইলে দেব না। সরকার ঠিকই দিয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমাদের দেয় নাই। আদর্শনগর, বড়র টেক সব জায়গায় এই অবস্থা। কেন তারা এমন করছে তার জবাব চাই। এক মুঠ চালও পাই নাই।

সিরাজগঞ্জে ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভ:
ত্রাণের দাবিতে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এলাকার হতদরিদ্ররা। লকডাউন উপেক্ষা করে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকালে ত্রাণবঞ্চিত দুই শতাধিক হতদরিদ্র মানুষ এ বিক্ষোভ করে।

ঘটনাটির পর ইউপি চেয়ারম্যানের লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে লাঠিসোটা নিয়ে বের হয়ে এক আওয়ামী লীগ নেতা ও এক কৃষক লীগ নেতার বাড়িসহ গ্রামের তিনটি বাড়ি ভাঙচুর করে। এ ঘটনায় নারীসহ দুজন আহত হয়েছেন। এরা হলেন মো. সজিব হোসেন (৩৫) ও মাকসুদা খাতুন (২০)।

এ বিষয়ে কৈজুরি ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য (মেম্বার) চাঁন প্রামাণিক এবং কৈজুরি ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সজিব হোসেন জানান, চরকৈজুরি গ্রামের ত্রাণবঞ্চিত দুই শতাধিক হতদরিদ্র মানুষ বাজারে জড়ো হয়ে চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে আধাঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। খবর পেয়ে চেয়ারম্যানের বড় ভাই আব্দুল খালেকের নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একটি দল লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালিয়ে তাদের তিনটি বাড়ি ভাঙচুর করে। তারা নারীসহ দুজনকে মারধরও করে।

রাজনীতিক বিশ্লেষকসহ সচেতন মানুষ মনে করছেন, ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম এখনই বন্ধ করতে হবে। অসহায় মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করতে ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব সেনা ও নৌবাহিনীর হাতে দিতে হবে। অন্যথায়, পরিস্থিতি করোনার চেয়েও আর ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

কেউ কেউ বলছেন, সরকার যদি এখনই অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ না করে তাহলে, দেশে বড় ধরণের দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। যারা অনিয়ম করছে তাদেরকে গ্রেফতার করতে হবে এবং এসব ত্রাণ সামগ্রী গরিবদের মাঝে বিলি করতে হবে।


সুত্র: অ্যানালাইসিস বিডি

SHARE THIS

0 Comments:

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।