আরশিতার প্রশ্ন - পর্ব: ০৩

আরশিতার প্রশ্ন

ডাক্তার সিনহা আমাকে জানালেন গতকাল রাতে আরো একটা মেয়ে সুইসাইড করেছে। কোনো কারণ ছাড়া সুইসাইড? ভাবা যায়??

ওনার সাথে কথা শেষ করে যখন নিচে নামলাম, দেখলাম দারোয়ান করিম আরশিতাকে একটা চকলেট দিয়ে আরশিতার গাল স্পর্শ করছে। আরশিতাকে কি কি যেনো বলছে। আমার মনের ভিতরে সন্দেহ জাগলো।তারমানে কি করিম আরশিতার সাথে ওইসব? সাতপাঁচ কিছু ভাবতে পারছি না। আমার মনে হলো করিম সব নষ্টের মূল। মেজাজ প্রচন্ড গরম হলো। করিমের কাছে গিয়ে ওরে মাইর শুরু করলাম-
"শালা নিমকহারাম, কুত্তার বাচ্চা, তুই আমার মেয়ের সাথে এইসব"?
ইচ্ছামতো ওরে মাটিতে ফেলে মাইর দিচ্ছি। করিমের চিৎকার শুনে মিহি নিচে আসলো। আমাকে থামানোর চেষ্টা করলো। বললো-
"মেহরাব পাগল হয়ে গেছো তুমিইই? কি করছো এগুলো"?
মিহির দিকে রাগান্বিত ভাবে তাকালাম। ভয় পেলো। আমার এতোটা রাগি চোখ আগে কখনো দেখেনি।
মিহি জানেওনা আরশিতা আমাকে কি প্রশ্ন জিজ্ঞাস করেছে। মিহি জানেওনা আরশিতার ওই একটা প্রশ্নের কথা ভেবে আমি এখন রাতে ঘুমাতে পারিনা।

করিমের মুখে জোরে জোরে আরো কয়েকটা কিল মারলাম।
মাটিতে থাকা অবস্থায় করিম কান্না করতে করতে বললো-
-স্যার আমি কি করছি? আমারে মারিয়েন না স্যার। আরশিতা ম্যাডামের মতো আমার একখান মাইয়া আছে গ্রামে, নিজের মাইয়াটারে দেখিনা বহুদিন, তাই আরশিতা ম্যাডামরে দেখলে নিজের মাইয়াটার কথা মনে পড়ে, একটু আদর করতে মন ছায়। আমারে আর মাইরেন না স্যার"।
করিমের এই কথাটা শুনে আমি মাইর থামালাম। করিমের একটা মেয়ে আছে এটা আমি জানি, আগে বলেছিলো আমায়। তারমানে করিম আরশিতার সাথে এসব করবেনা। মেয়েকে দেখেনা বহুদিন, হয়তো এজন্যই আরশিতাকে একটু আদর করতে ইচ্ছা হইছে"।

করিমকে মাটি থেকে তুললাম। কি বলবো বুঝতে পারছিনা। মাথা নিচু করে আস্তে করে বললাম-
"সরি করিম, আমার মাথা ঠিক নেই। টেনশনের মাথায় পাগলামি করে ফেলছি"।
আমার মাথা আসলেই ইদানিং ঠিক রাখতে পারছিনা। সারাদিন মাথাটা ভারী হয়ে থাকে। মনেহয় মাথার ভিতরে কিছু দৌড়াচ্ছে, পাগলের মতো কিছু একটা খুঁজছে, কিছু একটা।
ইদানিং মাঝেমাঝেই মনে হয় "আমি কি দিনদিন পাগল হয়ে যাচ্ছি"??
মিহিকে দেখলাম আমার দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে। এই মেহরাব তার কাছে বড্ড অপরিচিত।
করিমের দিকে তাকালাম, দেখলাম কান্না করতে করতে শরীর মুছতেছে। আমি পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে করিমের হাতে দিলাম। বললাম-
"কয়েকটা দিন গ্রাম থেকে ঘুরে আসো, তোমার বাচ্চাটার সাথে সময় কাটাও"।
কথাটা শুনে করিম কান্না করতে করতে একটা হাসি দিলো। কান্নার মধ্যে হাসি, কি অদ্ভুত সুন্দর এই হাসি"।
.
.
করিমকে খুশি করে, আরশিতাকে স্কুলে পৌছে দিয়ে থানায় আসলাম। সকালের ঘটনা মাথা থেকে সরাতে পারছিনা। যদিও করিমকে শেষে খুশি করেছি, কিন্তু এভাবে মাইর দেওয়াটা একদম উচিত হয়নি। কি করবো? আরশিতার প্রশ্নটা মাথায় এমনভাবে গেঁথে গেছে, কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল কিছুই বুঝতে পারছিনা৷ এমন সময়
কন্সটেবল আসিফ এসে বললো-
-স্যার পারমিশন দিলে একটা কথা জিজ্ঞাস করি"?
-হু বলো"।
-কয়েকদিন ধরে দেখছি আপনি অনেক টেনশনে আছেন। ভাবছিলাম হয়তো রেপ কেসটা নিয়ে টেনশনে আছেন, কিন্তু এখন তো সেটা শেষ হয়েছে। আপনার চেহারায় তারপরেও টেনশন দেখা যাচ্ছে। কি হয়েছে স্যার"?
একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আসিফকে বললাম-
-আরে তেমন কিছুনা, ওসমানীনগর হসপিটাল থেকে কল এসেছে, ওইখানে না'কি সবাই কোনো কারন ছাড়া সুইসাইড করছে৷ তার উপর আবার আরশিতার~~~ আমি থামলাম"।
আসিফ হয়তো বুঝতে পেরেছে মেয়েকে নিয়ে কিছু একটা টেনশনে আছি।
আসিফ বললো-
-স্যার আপনি ইদানিং একটু বেশিই চাঁপ নিচ্ছেন। আর কতো কাজ করবেন? আজকে বিকালে ফ্যামিলির সাথে কোথাও ঘুরে আসুন। ভাললাগবে"।
কথাটা খারাপ বলেনি আসিফ।
আমি সত্যি ভীষণ টায়ার্ড। আমার কিছুটা শান্তি দরকার, স্বস্তি দরকার।
ঠিক করলাম আরশিতার স্কুল ছুটির পর ওকে নিয়ে কোথাও ঘুরে আসবো"।
.
.
ছুটির ঘন্টাখানেক আগেই আরশিতার স্কুলে গেলাম। ক্লাস চলছে।
জানালা দিয়ে উঁকি মারলাম, দেখলাম আরশিতার টিচার পলাশ একটা বাচ্চা মেয়েকে ওর কাছে ডেকে নিলো। মেয়েটার দিকে অন্যদৃষ্টিতে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো, কামুক দৃষ্টি বলা যায়। আমি বুঝতে পারলাম না কি হচ্ছে।
পলাশ প্রথমে মেয়েটার কাঁধে হাত দিলো, বাচ্চা মেয়েটা ভয় পাচ্ছে।
পলাশ আঙুল দিয়ে মেয়েটার ঠোঁট স্পর্শ করলো। তারপরে বুকে হাত দিলো। আমার মাথায় তখনো কিছু ঢুকছে না। বুঝতে পারছিনা পলাশ এসব কেনো করছে। এই ছেলেটাকে আমি বহুদিন থেকেই চিনি, অনেক ভালো ছেলে হিসাবেই জানি। কিন্তু এসব??
আমি অবাক হয়ে দেখতে থাকলাম।
বাচ্চা মেয়েটা এবার রীতিমতো ভয় পেয়ে কান্না শুরু করে দিছে। পলাশ এবার মেয়েটার দুই উরুর মাঝখানে হাত দিলো। ছিঃ।
উরুতে হাত রেখে বললো-
"আমার কাছে একটা জিনিষ আছে, ওটা খেলে তুমি অনেক মজা পাবে"।
কথাটা শুনা মাত্রই আমার মাথায় রক্ত উঠে গেলো। তারমানে পলাশের কাছ থেকেই আরশিতা??
আর কিছু বুঝার বাকি নেই আমার। ক্লাসের ভিতরে গিয়ে পলাশের শার্টের কলার ধরে জোরে জোরে থাপ্পড় মারা শুরু করলাম।
"শালা শুওরের বাচ্চা। তুই না শিক্ষক। থুউউ তোর মুখে। এত খারাপ কিভাবে একটা মানুষ হতে পারে? একটা বাচ্চার সাথে?? থুউউউ"।
ক্লাসে থাকা বাচ্চাগুলোকে দেখলাম বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো ভয় পাচ্ছে। এখানে বাচ্চাদের সামনে পলাশকে কিছু করাটা ঠিক হবেনা। কুত্তার বাচ্চাটাকে থানায় নিয়ে আসলাম।

থানায় নিয়ে এসে পলাশের শার্ট খুলে ওর হাত বাঁধলাম। প্যান্টের বেল্ট খুলে অবিরাম ওর পিঠে মাইর শুরু করলাম।
থানার সবাই অবাক হয়ে আমাকে দেখছে, আজ পর্যন্ত কোনো আসামীকে এভাবে মারতে কেউ আমাকে আগে দেখেনি। মাইর থামালাম একটা মেয়ের কন্ঠ শুনে। মেয়েটা বললো-
"ভাইয়া থামুন, ওরে মারিয়েন না আর"।মেয়েটাকে আমি খুব ভালো করেই চিনি৷ মেয়েটার নাম রিয়া। আমাকে ভাই বলে ডাকে। মিহির ফ্রেন্ড, সেই সাথে ওর বড় পরিচয় হচ্ছে রিয়া এই লম্পট পলাশের স্ত্রী। মাইর থামিয়ে রিয়ার কাছে এসে বললাম-
-তুমি জানো পলাশ কি কি করেছে? তুমি জানো ও কতোটা খারাপ?? ছিঃ। আমার তো মুখে বলতেও ঘিন্না লাগছে"।
-আমি জানি ভাইয়া। সব জানি"।
রিয়ার কথা শুনে প্রচন্ড অবাক হলাম। রিয়া সব জানে? বললাম-
-তুমি সব জানো? তুমি জানার পরেও চুপ করে ছিলে? রিয়া, আমার তো এখন তোমাকে ঘিন্না লাগছে"।
-ভাইয়া এখানে পলাশের কোনো দোষ নেই, পলাশ পেডোফিলিয়াতে আক্রান্ত"।
ভ্রু কুঁচকে রিয়ার দিকে তাকালাম। বিষ্ময় নিয়ে জিজ্ঞাস করলাম-
-পেডোফিলিয়া? এটা আবার কি"?
রিয়া মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। একদম চুপচাপ। নিঃশব্দ। হয়তো আমাকে কিভাবে বলবে বুঝতে পারছেনা, লজ্জা পাচ্ছে।
কিছু সময় পর বললো-
- পেডোফিলিয়া একটি মানসিক রোগ ভাইয়া, যারা শিশুদের প্রতি যৌনাকৃষ্ট হয়ে থাকে"।
এই প্রথম আমি এরকম রোগের নাম শুনছি। কি বলবো বুঝতে পারছিনা। রিয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম, দেখলাম মেয়েটার বাম চোখ থেকে টুপ করে একফোঁটা পানি পড়ছে। কান্না জড়িত কন্ঠে রিয়া আবারো বললো-
- ভাইয়া লাস্ট ১বছর ধরে পলাশ আমার শরীরে একটাবারের জন্যেও ওইভাবে স্পর্শ করেনি। একজন স্ত্রীর কাছে এর চাইতে বড় কষ্ট আর কি হতে পারে?
বাসায় ১১বছরের কাজের মেয়েটার শরীরে দেখতাম মাঝে মাঝেই হাত দিতো, তাকিয়ে থাকতো, আমি বুঝতে পারতাম এগুলো কোন টাইপ দৃষ্টি। কোনো মেহমান বাচ্চা নিয়ে আসলে পলাশ খেলার অজুহাতে বাচ্চাটার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিতো। আমি বুঝতাম। সব বুঝতাম।
লজ্জা শরমে কাউকে কিছু বলতে পারছিলাম না, আবার সইতেও পারছিলাম না। তারপর এসব নিয়ে যখন কানাডায় থাকা আমার বড় আপির সাথে কথা বলি, তখন ওনি বলেন ওনার স্বামী মানে আমার জিজু ডাক্তার মাসুদের সাথে কথা বলতে। আমি জিজুর সাথে কথা বলে জানতে পারলাম এটা পেডোফিলিয়া। মানে শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ"।
কথাটা বলেই রিয়া আবার কান্না শুরু করলো। আমি বুঝতে পারলাম মেয়েটার ভিতরটা দুমড়েমুচড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঠিক ঐ মুহুর্তে রিয়াকে কি বলবো বা আমার ঠিক কি করা উচিত আমি জানিনা"।
মোবাইলের রিংটা বেজে উঠলো, ডাক্তার সিনহার কল। ধরলাম। ওনি কিছু বলার আগেই আমি জিজ্ঞাস করলাম-
- আচ্ছা ডাক্তার সাহেব, আপনাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানে পেডোফিলিয়া বলতে কোনো রোগ আছে"?
- জ্বী পেডোফিলিয়া নামে একটা মানসিক রোগ আছে। এই ধরনের রোগীরা সাধারণত বাচ্চাদের প্রতি যৌনাকৃষ্ট হয়ে থাকে। অনেক আগে থেকে এই রোগটা থাকলেও ১৯৯৭ সালে এটাকে রোগ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়"।
- এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই"?
- হু আছে। কিন্তু আমাদের দেশে বা খুব বেশি দেশে এটার উন্নত কোনো চিকিৎসা নেই বললেই চলে। তবে যুক্তরাজ্য এবং কানাডায় পেডোফিলিয়ার খুব ভালো পূর্ণবাসনের পক্রিয়া চালু হয়েছে"।
- আচ্ছা ধন্যবাদ"। আমি পরে কল দিচ্ছি"।
ফোনটা কাটতে যাবো ঠিক এমন সময় ডাক্তার সিনহা আবারো বললেন-
- মেহরাব স্যার শুনুন, যেটার জন্য আপনাকে কল দিছি, একটু আগেও আমাদের হসপিটালে একটা মেয়ে সুইসাইড করেছে। অথচ তাকে আমরা আগামীকালকে রিলিজ করে দেওয়ার কথা ছিলো। আপনি প্লিজ কিছু একটা করুন। প্লিজ"।
ডাক্তার সিনহার কথা শুনে আমি কিছু সময় চুপ করে থাকলাম। বললাম-
- এই বিষয়ে আপনার সাথে একটু পরে কথা বলি"?
- ঠিক আছে"।

ফোনটা কেটে রিয়ার দিকে তাকালাম। মেয়েটা এখনো অবিরাম কান্না করে যাচ্ছে। রিয়াকে বললাম-
- কি করতে চাচ্ছো এখন"?
কান্না জড়িত কন্ঠে রিয়া বললো-
- ভাইয়া আমি কিচ্ছু জানিনা, জিজু বললো কানাডায় ওনাদের কাছে না'কি পলাশকে নিয়ে যেতে হবে। এই কয়দিনে ভিসার সব কাজ শেষ। এখন আগামী এক সপ্তাহের ভিতর টিকেট কনফার্ম করে পলাশকে নিয়ে আপুদের কাছে চলে যাবো। দেখি ওখানে গিয়ে কি হয়"।
রিয়ার চোখের পানিগুলো থামছেনা। থামার কথাও না। একটা নারীর কষ্ট এই পৃথিবীতে সবার বুঝার ক্ষমতাও নেই। আমি রিয়ার মাথায় হাত রেখে বললাম-
"পলাশকে নিয়ে যাও। চিন্তা করিওনা, সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন"।
রিয়া পলাশের হাতটা ধরে হাঁটা শুরু করলো। আমি ওদের চলে যাওয়ার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। কি অদ্ভুত আমাদের এই পৃথিবী।

ওরা চলে যাওয়ার পর কন্সটেবল আসিফ বললো-
"স্যার হসপিটালের বিষয়টা কি করবেন? কেউ এমনি এমনি কোনো কারণ ছাড়া সুইসাইড কেনো করবে? আমার তো কিছু গন্ডগোল লাগছে স্যার"।
আমি আসিফের দিকে তাকিয়ে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম-
"চলো, এবার তাহলে হসপিটাল থেকেই ঘুরে আসা যাক"।

আসছে হসপিটাল রহস্য....প্রতিদিন ভিজিট করে সাথেই থাকুন

SHARE THIS

0 Comments:

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।