এ কেমন বিচার! - ছোটগল্প


আমাদের বাড়িওয়ালার মতন কৃপন ব্যক্তি আমি আমার লাইফে আরেকটা দেখিনি। খুলনা শহরে চারতলা বাড়ির মালিক কিন্তু দেখলে মনে হয় সংসার চালানোর জন্য প্রতি শুক্র আর শনিবার রুপসা ব্রিজের উপর কাসার প্লেট হাতে ভিক্ষা করেন। সংসার বলতে উনি, উনার স্ত্রী আর একমাত্র মেয়ে তুলি। তুলি মেয়েটা খুব নরম। নরম বলতে আমি ওর মন নরম বুঝাইনি। এরকম একটা খচ্চরের থেকে কিভাবে এতো কিউট আর তুলতুলে কারো জন্ম হতে পারে সেটা আমি তুলিকে না দেখলে কখনোই বিশ্বাস করতাম না। টাকার লোভে লোকটা মাত্র একটা রুম রেখে বাকি প্রতিটা রুম ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন। সেই রুমের খাটে ঘুমায় তুলি আর তুলির আম্মু, আর উনি ফ্লোরিং করেন। এজন্যই মেবি তুলির পরে উনার আর কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি! আমি কখনো মেহমান আসলে ঐ বাসায় রাতে থাকতে দেখিনি।
এইতো গেলো প্রস্তাবনা, এবার আসল গল্পে আসি। তার আগে আরেকটা কথা বলে রাখি, তুলিকে আমার খুব পছন্দ। পছন্দ মানে লাইক না। পছন্দ মানে লাভ। আর চারতলা বাড়ির একমাত্র উত্তরাধিকারীর বর হওয়ার চাইতে বেশি লাভজনক কিইবা হতে পারে!
.
খুলনায় একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ার সুবাদে এই বাসার নীচতলায় একটা রুম ভাড়া নিয়ে আমরা দুইজন থাকি। আমি আর আমার আরেকটা ফ্রেন্ড। সেমিস্টার ফাইনাল শেষ হওয়ার পর ছুটিতে বাসায় গিয়েছিলাম আমরা দুইজনই। বাসায় একটু ঝামেলার কারনে ছুটি শেষ হওয়ার আগেই আমি খুলনা চলে এসেছি। এসে দেখি শুধু আমার ফ্রেন্ড না, পুরো বাসাতে আর কেউ'ই নেই। এমনকি দারোয়ানও ছুটিতে। পুরো বাড়িতে মানুষ বলতে চারতলায় বাড়িওয়ালারা তিনজন আর নীচতলায় আমি একা। এই বাড়ির আশেপাশে কোনো বাড়িঘর নেই তেমন। বেশ ফাকা। কেমন গা ছমছমে একটা পরিবেশ। সেটাকে আরো একটু বাড়াতেই যেন সন্ধ্যা থেকে থেমে থেমে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হলো। রাত বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে লাগলো বৃষ্টির বেগ। রাত সাড়ে নয়টার দিকে শুরু হলো তুমুল ঝড়। হুট করে কারেন্ট চলে গেলো। আমি খুজে টুজেও কোনো মোমবাতি পেলাম না ঘরে। রীতিমতো হরর সিনেমার দৃশ্যপট। সেই মুহুর্তে আমার দরজায় থেমে থেমে তিনবার নক হলো। ঠক..ঠক..ঠক...!
.
আমার বুকের মধ্যে ধুকপুক শুরু হলো। তারপর কী- হোলে চোখ রেখে যা দেখলাম তাতে হৃদয়ের ধুকপুকানি আরো বাড়লো। তবে এবারে আর ভয়ের কারনে না, অন্য কারনে। দরজার সামনে মোমবাতি হাতে তুলি দাঁড়িয়ে আছে। আমি চুল টুল ঠিক করে, মুখে ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসাম মেখে, টিশার্টটা খুলে একটা নতুন শার্ট পরে দরজা খুললাম। দরজা খুলেই আশাভঙ্গ হলো। তুলির পেছনে ওর বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। তুলি একটু পাশে সরে গেলে তার বাবা আই মিন আমাদের বাড়িওয়ালা সামনে এগিয়ে আসলেন। তারপর আমাকে লক্ষ্য করে যা বললেন, সে কথাটা আমি অনেক চেষ্টা করেও আমার কানকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না। তিনি বললেন, 'বাবা ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে, এদিকের পরিবেশটা আবার ভালো না। তাই রাতে একা একা খালি বাসায় থাকা ঠিক হবে না তোমার। আমি তুলিকে তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি, রাতে থাকবে। আমিই থাকতাম কিন্তু ওদিকে আবার তোমার আন্টি ভয় পাবে। আর বুঝোই তো বৃষ্টির রাতে বউ এর কাছে থাকাটা..., এটুকু বলে উনি আমার দিকে চেয়ে চোখ টিপে দিলেন। আমি যাই কেমন? রাতে বেশি প্রবলেম হলে আমাকে ডাক দিও। আজ রাতে আর ঘুমানো হবে না মেবি। বলে, উনি আবার চোখে টিপলেন।'
তুলি রাগ দেখালো, 'উফ বাবা, এতো কথা বইলো না তো। এখন যাও।'
তুলির বাবা বললেন, 'আচ্ছা যাচ্ছি। কিন্তু তোরা আবার একরাতে তেমন কিছু করিস টরিস না। আর সাবধানে থাকিস।'
তুলি রুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো, 'বাবা আমি এখন যথেষ্ট এডাল্ট। তোমার এতো টেনশন করা লাগবে না। যাও তুমি। বলে দরজা বন্ধ করে দিলো।'
.
মেয়ে এইসব কি বলে! আমার কানটান পুরা গরম হয়ে গেছে লজ্জায়। আচ্ছা এমন কি হতে পারে এটা স্বপ্ন? আমি আশেপাশে তাকালাম। নাহ, ঐতো তুলির ঠোটে গাড় লাল লিপস্টিক দেখা যাচ্ছে। আমি যতোদূর জানতাম স্বপ্ন সাদাকালো হয়।
খুশিতে কয়েকটা চিৎকার দিলাম, কিন্তু মনে মনে। তুলি টেবিলে মোমবাতিটা রাখলো। সেই আলোয় আমি ভালোভাবে ওকে দেখতে পেলাম। অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে। পরনে পাতলা গোলাপি টিশার্ট। গলার ওড়নাটা খুলে চেয়ারে রাখলো। তুলি এমনিতেই খুব তুলতুলে। আজ যেন সবকিছু একদম গলে গলে পড়ছে। সেদিকে তাকিয়ে আমি খচ্চর বাড়িওয়ালার ভাড়া বাড়ানো, পানি না দেয়া, ঝাড়ি দেয়া; টাইপ এখন অব্দি করা যাবতীয় দোষ মাফ করে দিলাম। খুব কম ভাগ্যবান ব্যাচেলরের বাড়িতে এরকম বাড়িওয়ালা জন্মায়!
তুলি ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতে আমাকে বললো, 'তুমি বিছানা রেডি করো, আমি একটু ফ্রেস হয়ে আসছি।'
.
আমি আয়েশ করে বিছানায় উঠে হাতপা ছড়িয়ে বসলাম। বাইরে একটানা বৃষ্টি হচ্ছে। এমন বৃষ্টি যে বৃষ্টির রাতে পৃথিবীর প্রতিটা ব্যাচেলর তার বুকের মধ্যে একটা বউ এর অভাব নিয়ে ঘুমাতে যায়। তাদের এছাড়া অবশ্য কোনো উপায়ও থাকে না। সবার বাড়িওয়ালা তো আর আমার বাড়িওয়ালার মতো হয় না। বাইরে কোথাও প্রচন্ড শব্দে বাজ পড়লো। হাওয়ার ঝাপটা এসে মোমবাতির আলোকে কাপিয়ে দিয়ে গেলো। কিন্তু আমার এসবে কোনো খেয়াল নেই। আমি ভাবছি আজকে দুজন মিলে খেলা হবে। ইয়ে মানে প্লে স্টেশনে ফিফা'২০ গেম আরকি!
.
এমন সময় আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে আমাদের বাড়িওয়ালা মানে তুলির বাবার নাম্বার। এখন আবার কি? প্রটেকশন ইউজ করতে বলবে নাকি? আমি ফোনটা রিসিভ করলাম।
ওপাশ থেকে বাড়িওয়ালা বললো, 'হ্যালো কি ব্যাপার সোহাইল। কি খবর? কোনো প্রবলেম হচ্ছে না তো!'
আমি বললাম, 'আরে নাহ, কিসের প্রবলেম? সবকিছু ঠিকঠাক।'
উত্তরে বাড়িওয়ালা যা বললো সেটা শুনে আমি পুরোপুরি ঠাণ্ডা হয়ে গেলাম। তিনি বললেন, 'ইয়ে মানে আজকে হঠাৎ করে খবর আসলো আমার এক চাচা মারা গেছেন। তাই তখনই তুলি আর তুলির মাকে নিয়ে আমি ঢাকা চলে এসেছি। তোমাকে ব্যস্ততার কারনে বলে আসা হয়নি। তাই এখন কল দিলাম। এতোবড় বাড়িতে একা একা কি করছো, খুব টেনশন হচ্ছে। তুমি সাবধানে থেকো আমরা কালই ফেরত আসবো।'
আমার হার্টটা পরপর দুইটা বিট মিস করলো। হাত থেকে ফোনটা গড়িয়ে নিচে পড়ে গেলো।
.
ঠিক তখনই হুট করে ওয়াশরুমের দরজাটা খুলে গেলো। আস্তে আস্তে বের হয়ে আসছে তুলি। আসলে তো তুলি না, তুলির রুপ ধরে থাকা রাক্ষুসী বা পেত্নি। জিনিসটা ক্রমেই আমার দিকে এগিয়ে আসছে। মোমবাতির হলুদ আলোয় তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। আমি একটা চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে খাট থেকে নীচে পড়ে গেলাম।
.
আবারো দরজা নক করার ঠকঠক শব্দে আমার জ্ঞান ফিরে আসলো। জানালার ফাক দিয়ে আসা হালকা আলোতে বুঝলাম সকাল হয়ে গেছে। মাথার একপাশে ফুলে আছে, অল্প অল্প ব্যাথা। সেখানে হাত দিয়ে একে একে গতরাতের সব কথা মনে পড়লো। ভয় ভয় নিয়ে আস্তে করে উঠে বসলাম। তুলির মতো দেখতে সেই জিনিসটা ঘুমাচ্ছে খাটের উপরে। আমি আস্তে করে উঠে দরজার সামনে গেলাম। কী- হোলে চোখ রেখে আবারো ভয় পেয়ে গেলাম। বাইরে তুলির বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। তুলির বাবা, নাকি ঐ রুপের অন্যকিছু। এবার কি দুজন মিলে আমাকে ধরবে? আবারো জ্ঞান হারাতে যাবো এমন সময় আমার ফোন বেজে উঠলো। আসল তুলির বাবার নাম্বার। আমি রিসিভ করেই হড়বড় করে বললাম, 'আংকেল আমাকে বাঁচান, আংকেল প্লিজ বাঁচান। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।'
ওপাশ থেকে আংকেল বললেন, আরে আমি তোমার বাসার সামনে। দরজাটা খোলো।'

আমি একদৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম।
'আ আপনি না ঢাকা? চলে আসছেন? কখন আসছেন?'
'ধুর পাগল, আমি ঢাকা যাবো কোন দুঃখে। আমি তো বাসায়ই ছিলাম।'
'মা...মানে, কি বলছেন? আমি তো কিছুই বুঝছি না।'
'আচ্ছ বলছি সব, তুমি শান্ত হও। আংকেল মুচকি হাসলেন। আসলে কাল রাতে তোমার আন্টির সাথে খুব রোমান্স করতে ইচ্ছা হচ্ছিলো। কিন্তু তুমি তো জানোই তুলি আমাদের সাথেই থাকে। এজন্য ওকে তোমার কাছে দিয়ে গেলাম। আর তুমি যাতে আমার অবিবাহিতা মেয়ের কোনো সর্বনাশ না করতে পারো তাই আমি আর তোমার আন্টি বুদ্ধি করে ঐ মিথ্যা কলটা করেছিলাম। বুঝেছো তো ব্যাপারটা।'
আমাদের কথায় তুলির ঘুমও ভেঙে গেছে ততোক্ষণে। সে উঠে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙলো। বত্রিশ পাটি দাত বের করে আমাকে বললো, 'কি ব্যাপার সোহাইল সাহেব, রাত কেমন কাটলো! আমার কিন্তু জম্মেশ ঘুম হয়েছে।'
.
ওহ মাই গুডনেস। বাবা আর মেয়ের কথা শুনে আমি যে কিছু বলবো তার সমস্ত ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। হে খোদা! এ কেমন বিচার!


লেখা: সোহাইল রহমান

SHARE THIS

0 Comments:

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।