গালে টোল পড়া মেয়ে! - ছোট গল্প

'ভাইয়া, আমাকে বাঁচান প্লিজ।'
যে মেয়ে আমাকে কথাটা বললো, তার ডান গালে টোল পড়ে। সেই টোলের দিকে তাকিয়ে আমি মেয়েটাকে বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। টোল যদি বাজারে বেঁচাকেনা করার সিস্টেম থাকতো, তাহলে এই মেয়ে কমপক্ষে এক কোটি টাকা বিক্রি করতে পারত তার অদ্ভুত সুন্দর টোলটা। একজন গোয়েন্দা হিসাবে আমার জন্য কোনো মেয়ের সৌন্দর্য দেখে পাগল হওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। আমার কাছে কেস আগে, প্রেম পরে। আমি এই নিয়মটা সবসময় মেনে চলার চেষ্টা করি। কিন্তু এই মেয়ের কথা আলাদা। এই মেয়ের ডান গালে এক কোটি টাকা দামের একটা টোল আছে।

আমি অনেক কষ্টে নিজের চোখ মেয়েটার মুখ থেকে সরিয়ে নিলাম। এবার কোথায় রাখা যায় এটাকে। একটু নীচের দিকে নামাতেই মেয়েটা ওড়না টেনেটুনে ঠিক করলো। আমি আবার চোখ উঠিয়ে তার চোখে রাখলাম। বললাম, 'সমস্যাটা খুলে বলুন তো।'

গালে টোল পড়া মেয়ে

- ভাইয়া আমাদের বাসা হলো মিরপুরে।
- ও আচ্ছাহ। এটা তো খুব বড় সমস্যা। কিন্তু আমার কি করার আছে। আপনারা মিরপুর ছেড়ে অন্য কোথাও বাসা ভাড়া নিন।
- উফ, মিরপুর বাসা এটা সমস্যা না৷ সমস্যা হলো আমাদের জয়েন্ট ফ্যামিলি।
- দেখুন আমাদের দেশে বহু জয়েন্ট ফ্যামিলি আছে। সেজন্য যদি সবাই প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাছে হাজির হয় তাহলে তো প্রবলেম। আপনারা নিজেরা আলোচনা করে এই সমস্যা সমাধান করে নিন।
- আশ্চর্য মানুষ তো আপনি ভাই, মেয়েটা এবারে খুব রেগে গেল। কথা শেষই করতে দিচ্ছেন না। আমি কখন বললাম জয়েন্ট ফ্যামিলি সমস্যা। আপনি প্লিজ আমাকে কথা শেষ করতে দিবেন?
- আচ্ছা স্যরি, বলুন বলুন।
মেয়েটা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, 'আমরা জয়েন্ট ফ্যামিলি। বাসায় আমি, মা বাবা, দুইটা ছোট ভাই আর দাদী, এই ছয়জন থাকি৷ আমাদের বাসা ফিফথ ফ্লোরে।'
- সেক্ষেত্রে লিফট ব্যবহার করুন। ডিটেকটিভের কাছে আসার কি দরকার? ফিফথ ফ্লোরে বাসা ব্যাপারটা সমস্যা হলেও, খুব বড় কিছু না৷
.
এপর্যায়ে মেয়েটা আমার গালে ঠাস করে একটা চড় বসালো। ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ নতুন অভিজ্ঞতা। এর আগে কেউ তার সমস্যা আমাকে শুনাতে এসে চড় দেয়নি এভাবে। একজন মাথায় পেপার ওয়েট ছুড়ে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলো, আরেকজন লাথি মেরে চেয়ার থেকে ফেলে দিয়েছিলো। চড় এবারই প্রথম৷ আমাকে স্বীকার করতেই হলো যে, মেয়েটার হাত বেশ তুলতুলে। আমি থাপ্পড় খেয়ে মুগ্ধ। আরেকটা কিভাবে খাওয়া যায় সেটা ভাবছিলাম, দেখি মেয়েটা রুম থেকে বের হয়ে চলে যাচ্ছে৷
আমি দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলাম তার পেছন পেছন৷
বললাম, 'আমি খুব স্যরি। আমি আসলে দেখতে চাচ্ছিলাম আপনার ধৈর্য কতটুকু। একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসাবে কাজ করতে হলে আপনার প্রচন্ড ধৈর্য থাকতে হবে৷ ক্লায়েন্ট যা ই বলুক, রাগ করা যাবে না। কিন্তু আপনি রেগে গেলেন৷ আমি দুঃখিত, তারপরও বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনি খুব ভালো গোয়েন্দা নন।'
- আশ্চর্য! আমি গোয়েন্দা হতে যাব কেন? গোয়েন্দা আপনি। আমি আপনাকে আমার সমস্যা শোনাতে এসেছি। আপনি উল্টাপাল্টা কথা বলছেন। এখন তো আমার সন্দেহ হচ্ছে আপনি মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন।
এবার আমি আসল কথাটা বলে দিলাম, 'আমি আসলে স্যরি। আমি কোনো গোয়েন্দা না। গোয়েন্দা হলো আমার বন্ধু৷ এটা ওরই অফিস। আমাকে বসিয়ে রেখে ও মাছ ধরতে গেছে।'
- মাছ ধরতে গেছে মানে?
- মানে আমার বন্ধু গোয়েন্দাগিরির পাশাপাশি শখ হিসাবে ওর খালার বাসায় একুরিয়াম থেকে বরশি দিয়ে মাছ ধরে। গোল্ডফিশ, ক্যাটফিশ, এনজেল, এলিফ্যান্ট নোজ, ওরান্ডা, কমেট, ফাইন্টাল রানচু, টাইগার বাথ, ইত্যাদি। তবে সবচাইতে বেশি ধরে গোল্ডফিশ৷ ওরা শান্ত হয় তো, টপাটপ ধরা পড়ে।
- আপনার বন্ধু কি পাগল?
- না ও গোয়েন্দা। আপনি অফিসে এসে বসুন, ও এখনি চলে আসবে। এক কাপ চা খাই আমরা ততোক্ষণে। প্লিজ।
.
মেয়েটা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাজি হলো। আবার অফিসে ফিরে এসে চেয়ারে বসলো। আমি দ্রুত চা বানিয়ে দিলাম। এক চুমুক মুখে নিয়েই থু করে ফেলে দিলো।
- ওহ শিট, স্যরি স্যরি। আমি আসলে তাড়াহুড়ায় চায়ে পানি আর চাপাতা দিতে ভুলে গিয়েছিলাম।
- হোয়াট, তাহলে কি দিয়েছেন?
- কোক দিয়েছি। কোক গরম করে ফুটিয়ে চিনি দিয়ে দিয়েছি। ভেবে দেখলাম পানিতে চাপাতা দিলে তো কোকের মতই রঙ হয়। শুধু শুধু ওটা করতে গেলে অনেক টাইম নষ্ট হবে। তাই কোকটা গরম করে...।
.
এবারে মেয়েটা ভয়ে ভয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে। বললো, 'আপনার বন্ধু কখন আসবে। আপনি একটা ফোন করে দেখুন। নাহয় আমি আরেকদিন আসব। আমি আর থাকতে চাচ্ছিনা এখানে।'
আমি কল দিলাম বন্ধুকে। কথা হলো। ফোন রেখে বললাম, 'ও প্রায় চলেই এসেছে। পান্থপথ সিগন্যাল থেকে অফিসটা কোনদিকে আছে চিনতে পারছে না। আমি গিয়ে ওকে নিয়ে আসি?'
- আপনার বন্ধু তার নিজের অফিস চিনতে পারছে না?
- উহু, এর আগে কখনো আসেনি তো। এইজন্য। আজকেই প্রথম। আপনি বসুন, আমি যাব আর আসব।
মেয়েটাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বের হয়ে গেলাম।
.
দুই মিনিটে ফেরত আসলাম। গম্ভীর গলায় বললাম, 'এক্সকিউজ মি আপু, আমি ডিটেকটিভ সিয়াম আহমেদ। আমার বন্ধু আমাকে আপনার কথা বললো। ও একটু পাগল টাইপের। বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি। আপনার সমস্যাটা খুলে বলুন প্লিজ।'
- হোয়াট, আপনি আবার এসে এসব কি বলছেন? সমস্যা কি আপনার? আপনিই আপনার বন্ধু?
- জ্বী না আপু, আমরা আসলে জমজ বন্ধু৷ এজন্য চেহারা এক।
- সেক্ষেত্রে আপনারা ভাই হবেন, বন্ধু না৷ তাইনা?
- নাহ, আমি আমার ভাইকে সবসময় বন্ধুর চোখেই দেখেছি। একই বাবার পেটের সন্তান হয়েও কখনো ভাই ভাবিনা একজন আরেকজনকে। বন্ধু ভাবি।
- বাবার পেটের সন্তান?
- জ্বী, আমরা আমার মা কে বাবা হিসাবেই ভেবে এসেছি সবসময়। বাবাকে খালু, দাদাকে ছোট ফুফু, বোনরা সব চাচাতো ভাই। আমাদের ফ্যামিলির এটাই নিয়ম।
.
মেয়েটা হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরলো। বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই রইলো। তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, 'দেখুন মিস্টার সিয়াম আহমেদ, আমার ভুল ছিল আপনার কাছে আসা। এই জীবনে আমি কখনো আর কোনো প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাছে যাব না। মরে গেলেও না। এখন আমি বাসায় যাচ্ছি। প্লিজ আমাকে আর বিরক্ত করার চেষ্টা কইরেন না। আর আপনার জন্য পরামর্শ থাকবে, দয়া করে এসব গোয়েন্দাগিরি বাদ দিয়ে একজন ভালো মানসিক ডাক্তারের সাথে কনসাল্ট করুন। বিদায়।'
.
মেয়েটা চেয়ার থেকে উঠে পড়লো। আমাকে খুব দ্রুত কিছু করতে হবে। এই মেয়েকে কোনোভাবেই যেতে দেয়া যাবে না। আমি ড্রয়ার থেকে ছুরি বের করলাম। বললাম, 'দেখুন, আপনি এখন চলে গেলে আমি আমার হাতের রগ কেটে ফেলব। সুইসাইড করব। আপনি প্লিজ আপনার সমস্যা বলে যান।'
.
মেয়েটা ভয় পেয়ে গেছে। ভেবেছে সত্যি সত্যি আমি হাত কাটবো। কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, 'আমি আপনার কি ক্ষতি করেছি? আপনি এরকম করছেন কেন? আমাকে মাফ করে দিন প্লিজ।'
- উহু, আপনি আপনার সমস্যা বলুন। আমি সমাধান দিব, তারপর যাবেন।
.
'আচ্ছা ঠিক আছে, বলছি। মেয়েটা চেয়ারে বসলো, একদম শুরু থেকে বলি। আমার নাম কানিজ।'
- এটা আপনার সমস্যা? এতোক্ষণ বলবেন না? নাম চেঞ্জ করে ফেলুন। আচ্ছা আমিই চেঞ্জ করে দিচ্ছি। আজ থেকে আপনার নাম শাহনেওয়াজ। এবার ঠিক আছে?'
কানিজ নামের মেয়েটা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, 'হ্যা, এটাই সমস্যা ছিলো আমার। থ্যাংক ইউ সো মাচ আপনি সমাধান করে দিলেন। আপনার এই ঋণ আমি ভুলব না কোনোদিন। আজ থেকে আমার নাম আর কানিজ না। আমার নাম শাহনেওয়াজ। একটু ছেলে টাইপ নাম যদিও, তবে সমস্যা নেই। আমি খুবই খুশি। মাথা থেকে অনেক বড় চিন্তা নেমে গেল একটা৷ এই নিন আপনার ফিসের টাকা। এখন আমি যাচ্ছি, কেমন? বাই।'
.
মেয়েটা চলে গেল। আমি টাকাটা ড্রয়ারে রেখে দিলাম। এই নিয়ে আজ তিন নাম্বার কেস সফলভাবে সলভ করতে সক্ষম হলাম। ডায়েরি খুলে নোট করে রাখলাম, নোট রাখাটা জরুরি।
.
.
মেয়েটার সাথে আমার আবার দেখা হলো প্রায় তিন বছর পর। আইডিয়াল স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছিলো। আমি পরিচয় দিলাম।
- হাই, আমি সিয়াম আহমেদ, আমাকে চিনেছেন?
- না তো, ঠিক চিনলাম না।
- আরে আপনি একবার আপনার নামের সমস্যা নিয়ে আমার অফিসে এসেছিলেন। আমি কানিজ নাম চেঞ্জ করে শাহনেওয়াজ রেখে দিলাম। মনে আছে?
হুট করে মেয়েটার চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল। অনেক কষ্টে মুচকি হেসে বললো, 'জ্বী মনে আছে। তো আপনার গোয়েন্দাগিরি কেমন চলছে?'
- গোয়েন্দাগিরি তো চলছে না৷ আপনিই আমার লাস্ট কাস্টমার ছিলেন। আপনার পরে যিনি এসেছিলেন উনি একজন সচিব৷ উনি বললেন, উনার সমস্যা হলো, উনার মাথার চুল নাকি বড়ো। তো আমি কাচি দিয়ে কেটে দিলাম অফিসে বসেই। পরদিন পুলিশ এসে আমাকে ধরে নিয়ে গেলো। অফিসও বন্ধ করে দিল।
- আচ্ছা, শুনে দুঃখ পেলাম। তো এখন কি করছেন?
- এখন সিনিয়র সাংবাদিক হিসাবে কর্মরত আছি।
- বাহ, কোন পত্রিকায়।
- কোনো পত্রিকায় না, একটা সিমেন্ট কোম্পানিতে।
- সিমেন্ট কোম্পানীতে সাংবাদিকের কি কাজ?
- সেটা আমিও ওদের জিজ্ঞেস করেছিলাম। ওরা কোনো সদূত্তর দিতে পারেনি। বলেছে আপাতত ট্রাকে সিমেন্টের বস্তা উঠালেই হবে। সেটাই করছি।
- জ্বী করতে থাকুন, আমি আসি। কানিজ ওরফে শাহনেওয়াজ ফুচকার বিল মিটিয়ে হাটতে শুরু করল। আমি তখন খেয়াল করলাম ওর ডানগালের টোলটা আগের থেকে ছোট হয়ে গেছে। ও মোটা হওয়ার জন্য হতে পারে।
বললাম, 'আপনার টোলের জন্য আর কেউ এককোটি টাকা দেবে না।'
- হোয়াট, কি বলছেন?'
- ঠিকই বলছি। বেশি হলেও কুড়ি হাজার দিবে। যান, আমি এক দাম চল্লিশ দিব। এর বেশি পারব না। রাজি?
.
শাহনেওয়াজ কোনো কথা না বলে দ্রুত হাটা শুরু করলো। আমিও ওর পেছন পেছন গেলাম। টোলটা আমার কেনা লাগবে, আর্জেন্ট!

লেখক:- সোহাইল রহমান

SHARE THIS

0 Comments:

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।